যা পড়বে, যেভাবে পড়বে

তোমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন আছে—বিডিজেএসও-র জন্য কী কী পড়বে। কীভাবে প্রস্তুতি নিতে পারো—সেই সম্পর্কে নিচে লেখা আছে। প্রথম ধাপের প্রস্তুতির জন্য ক্লাসের বই সাজেস্ট করা হয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস মাথায় রাখতে পারো—ক্লাসের বইতে অনেক কিছুই আছে যেগুলো পরীক্ষার জন্য তোমাদের মুখস্থ করতে বলা হয়। মজার ব্যাপার হল, ঐ জিনিসগুলোর বেশিরভাগের পেছনেই অনেক চমৎকার কিছু বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকে, যেগুলো বুঝতে পারলে আর মুখস্থ করতে হয় না। বিডিজেএসও-তে যেহেতু মুখস্থ করে কোনো লাভ হবে না, কাজেই যখন পড়বে তখন সেগুলো বুঝে পড়ার চেষ্টা করবে।
বিডিজেএসও-র জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে চাইলে তুমি কয়েকটি ধাপে আগাতে পারো—

প্রথম ধাপ

যারা একটু ছোট, প্রথমে তোমাদের নিজেদের ক্লাসের বিজ্ঞান বই শেষ করতে হবে। বোঝার ক্ষেত্রে সমস্যা হলে আশেপাশের বড়দের কাছে কিংবা তোমার শিক্ষকদের থেকে সাহায্য নিতে পারো। ইন্টারনেট ঘেঁটেও বোঝার চেষ্টা করতে পারো। এমনকি বন্ধুরা বন্ধুরাও আলোচনা করে সমাধান করে ফেলতে পার। এবং সেটাই মনে হয় সহজ উপায়, কার্যকরীও!
ক্লাসের বইয়ের অনেক কিছুই অস্পষ্ট লাগতে পারে। এই লেখার শেষ অংশে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন আর জীববিজ্ঞানের জন্য আলাদাভাবে কিছু বই নাম দেওয়া হয়েছে। ক্লাসের বই পড়ে কোনো কিছু বুঝতে সমস্যা হলে ওই বইগুলো থেকে দেখতে পারো। বইগুলো ইংরেজিতে লেখা, কিন্তু খুব চমৎকার করে সহজ ভাষায় লেখা, কাজেই পড়তে সমস্যা হওয়ার কথা না।

দ্বিতীয় ধাপ

ক্লাসের বিজ্ঞান বইটুকু শেষ করে ফেললে তুমি পরের ক্লাসের বই ঘেঁটে দেখতে পারো।
সেই সাথে বইয়ের গাণিতিক সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে। খুব ভালো হয়, যদি নিজে নিজে এগুলো সমাধান করার চেষ্টা কর। দিনের পর দিন চেষ্টা করেও যদি কোনো সমস্যা সমাধান করতে না পারো— তখন অন্য কারও সাহায্য নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতে পারো। (মনে রাখবে, দ্রুত সমাধান করে ফেললেই সবকিছু হয়ে যায় না। সমাধান বের করে ফেলার চেয়ে বের করার চেষ্টাটা ইম্পর্টেন্ট। কেউ যদি একটা সমস্যা দিনের পর দিন ধরে সমাধান করার চেষ্টা করে, তাহলে তার মস্তিষ্ক আরও চমৎকার কাজ করা শুরু করে!)
বিজ্ঞানের বেশকিছু গাণিতিক সমস্যা আছে, যেগুলো সমাধান করার জন্য ত্রিকোণমিতি, ফাংশন, ফাংশনের গ্রাফ, ভেক্টর—এই জিনিসগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হয়। কাজেই এগুলো পড়তে পারো।
একটা জিনিস মনে রেখ, পাটিগণিতে ঐকিক নিয়ম নামে একটা জিনিস তোমরা শিখেছ নিশ্চয়ই। ঐকিক নিয়ম কিন্তু খুবই দরকারি একটা জিনিস। পদার্থবিজ্ঞান আর রসায়নের অনেক কিছু বুঝতে, সমস্যা সমাধান করতে এর ধারণা খুব কাজে দেয়। তাই ঐকিক নিয়মের খুঁটিনাটি ব্যবহার শিখে নিতে হবে খুব ভালো করে।

তৃতীয় ধাপ

যারা একটু বড়, মোটামুটি অষ্টম শ্রেণি বা তার উপরে, তাদের জন্য ক্লাসের বইয়ের বাইরে কয়েকটা বইয়ের নাম বলছি। এসব পড়ে দেখতে পারো—

পদার্থবিজ্ঞান

১. পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম পাঠ (লেখক: মুহম্মদ জাফর ইকবাল, প্রকাশনী: তাম্রলিপি)
এই বইটি মূলত নবম-দশম শ্রেণির জন্য লেখা, কাজেই তোমরা চাইলে নবম-দশম শ্রেণির বোর্ডের বই পড়ার আগে এই বইটি পড়তে পারো। (সত্যি বলতে কী, আমরা এই বইটি পড়তে বলব খুব গুরুত্ব দিয়ে।) পুরো বইটিই পড়তে হবে এবং সেই সাথে অধ্যায়ের শেষে যেসব সমস্যা দেয়া আছে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।
২. উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান - ১ম ও ২য় পত্র (লেখক: তফাজ্জল হোসেন। ভালো হয় যদি ২০১২ বা তার দুই এক বছর আগের সংস্করণ কিনতে পারো। ঢাকার নীলক্ষেতে পাওয়ার কথা।)
এই বই দুটো কলেজের জন্য লেখা। তবে নবম-দশম শ্রেণির অনেক কিছুই এই বইতে আছে, কাজেই বুঝতে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা না। শুধু একটু সমস্যা, বইতে ক্যালকুলাস দিয়ে অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করা আছে। যদি ক্যালকুলাস না বোঝো, তাহলে ঐ অংশগুলো বাদ দিতে পারো। বই দুটোতে প্রচুর অংক আছে, ওগুলো চর্চা করতে হবে।
যেহেতু এই বইয়ের ২০১২-র আগের এবং পরের সংস্করণ আলাদা, বিভ্রান্ত্রি এড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলোর নাম আলাদা করে লিখে দিচ্ছি—
ভেক্টর, রৈখিক এবং দ্বিমাত্রিক গতি, গতিসূত্র, কৌণিক গতিসূত্র, কাজ-শক্তি-ক্ষমতা, মহাকর্ষ, সরল ছন্দিত স্পন্দন, স্থিতিস্থাপকতা, তাপ ও গ্যাস, তাপমাত্রা, তাপগতিবিদ্যার প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্র, তাপ বিকিরণ, অবস্থার পরিবর্তন, তরঙ্গ, শব্দ, ডপলার প্রভাব, স্থিরতড়িৎ ও চলতড়িৎ, তড়িতচৌম্বক তরঙ্গ, আলো, আলোর প্রতিফলন, আলোর প্রতিসরণ, দর্পণ ও লেন্স, আলোক যন্ত্র।
৩. Physics (হুম, বইটার নাম শুধু ফিজিক্স-ই! লেখক: Resnick, Halliday and Krane, প্রকাশনী: Wiley, 5th edition। এখানে বলে রাখা দরকার, Resnick, Halliday and Walker এর লেখা একটা আলাদা বই আছে— Fundamentals of Physics। আমরা কিন্তু সেটার কথা এখানে বলছি না।)
বইটির দুটো খণ্ড আছে—Volume 1 এবং Volume 2. এই বইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য লেখা, কিন্তু বেশ চমৎকার বই। যদি ক্যালকুলাস না বোঝো তাহলে ক্যালকুলাসের অংশগুলো বাদ দিতে পারো। বইয়ের অধ্যায়গুলোর শেষে কনসেপ্টভিত্তিক প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনই গাণিতিক সমস্যাও আছে। আপাতত পুরো বই শেষ না করলেও চলবে, যেসব অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হল—১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৬, ৩৯, ৪০, ৪১, ৪২, ৪৫ এবং ৫২।
সবচেয়ে ভালো হয় যদি প্রথমে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম পাঠ বইটি শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান বইটি ধরো, এবং সেটিও ভালোমত বুঝে পড়ার পর রেজনিক—হ্যালিডে—ক্রেনের ফিজিক্স বইটি পড়ো।
আরও একটা বই দেখতে পারো চাইলে, জাফর ইকবাল স্যারের “দেখা আলো না দেখা রূপ”। আলো সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো খুব চমৎকার বুঝতে পারবে। যদিও এই বইয়ে কোন অংক মানে সমস্যা দেওয়া হয় নাই। তবুও কনসেপ্ট ক্লিয়ার হবে ভালো করে।

রসায়ন

১. Chemistry (লেখক: Raymond Chang, প্রকাশনী: McGraw-Hill Education )
২. General Chemistry (লেখক: Ebbing—Gammon, প্রকাশনী: Cengage Learning) বইয়ের Part 1 থেকে Part 4 পর্যন্ত।
উপরের বই দুটো মূলত ভার্সিটিতে পড়ানো হয়। কিন্তু বিশ্বাস করো আর নাই করো, বইটিতে রসায়নের বেসিক ব্যাপার-স্যাপারগুলো একেবারে জলবৎ তরলং করে বোঝানো হয়েছে, ইলাস্ট্রেশানও বেশ চমৎকার, পড়ে মজা পাওয়ার কথা। শুধু বেসিক বললে ভুল হবে, বইটা থেকে তুমি রসায়নের গভীরেও ডুব দিতে পারবে, সেক্ষেত্রে গভীরতা বেছে নেয়ার স্বাধীনতা তোমার, তুমি কতটা সময় দিতে পারবে তার ওপর। সেক্ষেত্রে IJSO—র মূল সিলেবাসের সাথে মিল রেখে পড়াই বেশি কাজে দেবে।
৩. Fundamentals of Analytical Chemistry (লেখক: Douglus A. Skoog, প্রকাশনী: Brooks Cole)
ক্রোমাটোগ্রাফি আর সেপারেশন টেকনিকের জন্য এই বইয়ের চ্যাপ্টার ৩১, ৩২, ৩৩ দেখতে পারো।

জীববিজ্ঞান

(১) মাধ্যমিক জীববিজ্ঞান (বোর্ডের বই)
(২) উচ্চ মাধ্যমিক প্রাণিবিজ্ঞান (লেখক: গাজী আজমল, প্রকাশনী: গাজী পাবলিশার্স)
(৩) উচ্চ মাধ্যমিক উদ্ভিদবিজ্ঞান (লেখক: আবুল হাসান, প্রকাশনী: হাসান বুক হাউজ)
(৪) Campbell Biology (লেখক: Reece, Urry, Cain, প্রকাশনী: Pearson)
এই বইটা জীববিজ্ঞান অংশের পরিপূর্ণ প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকের বইগুলি পড়ে শেষ করে তুমি এই বইটা শুরু করতে পারো, কিংবা চাইলে এমনিতেই শুরু করতে পারো। বইটায় কোন একটা টপিকের একদম বেসিক কনসেপ্ট থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। খুব সহজ করে লেখা হয়েছে, ছবি এবং ইলাস্ট্রেশনগুলিও চমৎকার, কাজেই আমাদের ধারণা তুমি বইটা পড়ে মজা পাবে।
(৪) Fundamentals of Anatomy and Physiology (লেখক: Martini—Nath, প্রকাশনী: Pearson)
এই বই থেকে যেসব চ্যাপ্টার পড়তে পারো সেগুলো হল—
Chapter 3: The Cellular Level of Organization
Chapter 4: The Tissue Level of Organization
Chapter 10: Muscle Tissue
Chapter 11: The Muscular System
Chapter 28: The Reproductive System
Chapter 29: Development and Inheritance
(৫) Principles of Genetics (লেখক: Snustad—Simmons, প্রকাশনী: John Wiley and Sons)
জেনেটিক্সের জন্য এই বইটি দেখতে পারো। প্রায় আটশো পৃষ্ঠার একটা বই, কাজেই পুরোটা না পড়লেও চলবে! আপাতত জেনেটিক্সের কোনো অংশ বুঝতে সমস্যা হলে এই বইটা থেকে সেই অংশটুকু পড়ে দেখতে পারো।
(৬) Microbiology (লেখক: Tortora—Funke—Case, প্রকাশনী: Benjamin Cummings)
এই বই থেকে নিচের চ্যাপ্টারগুলো দেখতে পারো—
Chapter 14: Principles of Disease and Epidemiology
Chapter 18: Practical Applications of Immunology
(৭) Lehninger Principles of Biochemistry (লেখক: David L. Nelson—Michael M. Cox, প্রকাশনী: W.H. Freeman)
কোষ এবং কোষের বায়োকেমিস্ট্রির জন্য এই বইটা দেখতে পারো।
(৮) Microbial Ecology (লেখক: Atlas—Bartha, প্রকাশনী: Benjamin Cummings)
ইকোলজির জন্য এই বই দেখতে পারো।
উপরের সবগুলি বইই যে তোমার পড়তে হবে তা-না। মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক জীববিজ্ঞান বই এবং Campbell Biology -এই বই কয়টা ভালোভাবে পড়লে জীববিজ্ঞান অংশের প্রস্তুতি হয়ে যাবে। তোমার যদি কোন একটা টপিক নিয়ে আলাদাভাবে জানতে ইচ্ছে হয়, তখন বাকি বইগুলি থেকে সাহায্য নিতে পারো। আর ইন্টারনেট তো আছেই!

চতুর্থ ধাপ

প্রস্তুতির মাঝপথে, বইগুলি থেকে কোন একটা টপিক পড়ে শেষ করার পর কিংবা অন্য যেকোনো সময়ে তোমার যদি যাচাই করে দেখতে ইচ্ছে হয় যে, তুমি BdJSO কিংবা IJSO এর প্রশ্নগুলি সমাধান করতে পারবে কিনা, তাহলে তুমি নিচের লিংকগুলো থেকে প্রশ্ন ডাউনলোড করে নিতে পারো। IJSO -র ওয়েবসাইটে কিন্তু প্রশ্নের পাশাপাশি সমাধানও দেয়া আছে। আমরা সাজেস্ট করবো যে, তুমি কোন একটা প্রশ্ন প্রথমবার চেষ্টা করে সমাধান করতে না পারলেই সমাধান দেখতে যেও না।
একটা সমস্যা একবারে সমাধান করা না-ই যেতে পারে, কিন্তু সেজন্য হাল ছেড়ে দিলে হবে না। সমাধান দেখে নিলে কিন্তু তোমার মস্তিষ্ক আসলে শেষ পর্যন্ত কোন কিছু চিন্তা করে বের করতে শিখছে না। একটা সমস্যা সমাধান করতে হয়তো তোমাকে একবারের জায়গায় পাঁচবার, দশবার, এমনকি পঞ্চাশবার চেষ্টা করতে হতে পারে। যতবার তুমি চেষ্টা করবে, প্রতিবারই কিন্তু একটু একটু করে তোমার চিন্তা করার দক্ষতা বাড়বে। তুমি একটা সমস্যাকে বিভিন্নভাবে আক্রমণ করতে শিখবে। প্রথম প্রথম হয়তো একদিনে কিংবা এক সপ্তাহেও একটা সমস্যা সমাধান করতে পারবে না, হয়তো পনের-বিশ দিন কিংবা এক মাস লেগে যাবে। কিন্তু তুমি যখন নিজের চেষ্টায় প্রথমবারের মতো একটা সমস্যা সমাধান করতে পারবে, তখন তোমার যে আনন্দ হবে, সেটা যে কী অবিশ্বাস্যরকম তীব্র, সেটা তোমার নিজেরই বিশ্বাস হবে না! এভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলে, তুমি আস্তে আস্তে আরো দ্রুত সমস্যা সমাধান করতে পারবে।
IJSO-র প্রশ্ন: http://www.ijsoweb.org/downloads